বুধবার, 25 জুলাই 2012 01:49

অপূর্ব সুন্দর হাম হাম জলধারা

Rate this item
(0 votes)

জাবেদ হাকিম

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা পাহাড়ি পথবাংলাদেশের শেষ সীমান্ত ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য লাগোয়া হাম হাম জলপ্রপাতের অবস্থান। কমলগঞ্জ উপজেলার কলাবন থেকে দু'ভাবে সেখানে যাওয়া যায়। যারা পাহাড়, টিলা, ট্রেকিং করতে পছন্দ করেন তাদের জন্য একটি পথ আর যারা তুলনামূলক কম পরিশ্রমে যেতে চান তাদের জন্য ঝিরি পথ। লিখেছেন জাবেদ হাকিম

হাম হাম নামের মধ্যেই কেমন যেন একটা রহস্যের গন্ধ। আসলেও তাই! তবে 'দে ছুট; ভ্রমণ সংঘের বন্ধুরা সেই রহস্য ভেদ করে হাম হামের বুক চিরে পেঁৗছে গিয়েছিল একেবারে শেষ প্রান্তে। ঢাকা থেকে রাত ৯টার গাড়িতে চেপে শেষ রাতে শ্রীমঙ্গলে গিয়ে পেঁৗছলাম। আগে থেকেই গিতাশ্রী বস্ত্রালয়ের ব্যবসায়ী সুদীপ দা হোটেলে রুম বুকিং করে রেখেছিলেন। ফলে বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হয়নি। ধন্যবাদ তার প্রসারিত মানসিকতার জন্য। রুমে গিয়ে দুই ঘণ্টা মরিচ পোড়া ঘুম (বিছানায় শুয়ে চোখ বুজে থাকা) দিয়ে ভোর সাড়ে ৫টায় সিএনজি চালকের মোবাইল ফোনের কলে ঘুম ভাঙল। ঘড়িতে তাকিয়ে অবাক হলাম, একজন গাড়ি চালকের সময়জ্ঞান দেখে। যেমন কথা তেমনি কাজ। অথচ যাদের থাকার দরকার তাদের এক কথায় নেই বললেই চলে।
ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে পড়লাম। আমাদের পাঁচজনকে সিএনজির কাঁধে ও পেটে পুরে স্বপন বীরদর্পে ছুটে চলল। মাঝে ভানুগাছে ব্রেক। নাশতা পর্ব ও শুকনো খাবার কেনা হলো। গাড়ি থামল কোরমা বনবিটের আওতাধীন কলাবনে। কথামতো গাইড সুমন উপস্থিত। তার হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গি আমাদের বিমোহিত করল। গাইড পাঁচজনকে ৫টি বাঁশের লাঠি ধরিয়ে দিল। শুরু হলো মূল পর্ব।
বাংলাদেশের শেষ সীমান্ত ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য লাগোয়া হাম হাম জলপ্রপাতের অবস্থান। কমলগঞ্জ উপজেলার কলাবন থেকে দু'ভাবে সেখানে যাওয়া যায়। যারা পাহাড়, টিলা, ট্রেকিং করতে পছন্দ করেন তাদের জন্য একটি পথ আর যারা তুলনামূলক কম পরিশ্রমে যেতে চান তাদের জন্য ঝিরি পথ। আমরা দ্বিতীয়টি বেছে নিলাম।
লাঠি বাঁশে ভর করে হেলেদুলে কখনওবা গাইডের পুরোপুরি সাহায্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। হাম হামের অবিরাম জলে দুই পাহাড়ের মাঝে সৃষ্ট ঝিরিপথ দিয়ে যাচ্ছি। মাত্র ২ বছর হলো এই ঝর্ণাটি আবিষ্কার হয়েছে। তাই এখনও এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য শতভাগ বিদ্যমান। পথের নজরকাড়া নিসর্গ, হিম হিম ঠাণ্ডা পানি, ছায়াশীতল প্রকৃতি ভ্রমণপিপাসুদের দেয় বাড়তি আনন্দ আর চিরচেনা প্রাণী দুষ্ট বানর পুরোটা পথ আপনার সঙ্গী। তাদের নৃত্য, লম্প-ঝম্পের কারণে দেহের ক্লান্তি ভয়ে থাকে বহুদূর। মনের ক্লান্তি সে তো দিনের আলো মলিন হয়ে যাওয়া ঘন জঙ্গলে হঠাৎ সূর্যের রশ্মির ছটায় দৌড়ে পালায়।
প্রায় দেড় ঘণ্টা হাঁটার পর আনু মিয়ার মুলি বাঁশের মাচা পাতানো চায়ের রেস্টুরেন্টে খানিকটা সময় চা চক্র হলো। তার কথায় জানতে পারলাম তিনিই নাকি প্রথম হাম হাম জলপ্রপাতের আবিষ্কারক। সত্য-মিথ্যা কতটা সেদিকটায় না গিয়ে তার কাছ থেকে জায়গাটির সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিলাম। আলাপচারিতায় জানা হলো ইতিমধ্যে আরও একটি জলপ্রপাতের সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে এখনই পর্যটকদের যাওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি, চা পর্ব শেষ।
এবার পার হতে হবে খাড়া একটি পাহাড়। তবে আনু মিয়া নিজ উদ্যোগে পাহাড়ে পা ফেলার জন্য খাঁজ কেটে দিয়েছে, বিনিময়ে সামান্য বকশিশ। প্রায় আরও ১ ঘণ্টা চড়াই-উৎরাইয়ের পর পেঁৗছলাম মায়াময় অপার সৌন্দর্যের হাম হাম জলপ্রপাত। ওয়াও! এত সুন্দর রূপ তোমার, বহুকাল তুমি নিজেকে লুকিয়ে রেখেছ, বল কোন অভিমানে? এ দেশের সৌন্দর্যপিয়াসী-ভ্রমণপিপাসুর দল ঠিকই তোমাকে খুঁজে বের করেছে। বিলিয়ে দাও তোমার মোহনীয় রূপ। যেমনি উজাড় করে দিয়েছে তোমার পানে আসার পথের প্রকৃতি। এ উক্তিগুলো হাম হামের সামনে দাঁড়িয়ে আপন মনেই বলেছিলাম। এ জীবনে বেশ কয়েকটি জলপ্রপাত দেখেছি। তবে কোনোটির সঙ্গে কোনোটির তুলনা হয় না। প্রতিটির সৌন্দর্যই ভিন্ন ভিন্ন আবেশের, ভিন্ন কোনো এক অনুভূতির। শীত মৌসুম তাই খানিকটা জলধারা কম তার ওপর ত্রিপুরা অংশে মোটর লাগিয়ে পানি টেনে নিচ্ছে কান পাতলেই শোনা যায় মোটরের আওয়াজ। তবে প্রকৃতির কৃপায় সৌন্দর্যের হানি হয়নি হাম হামের।
এবার পানির উৎস খোঁজার জন্য দে ছুটের দল সবচেয়ে উঁচু ও খাড়া একটি পাহাড় ট্রেকিং করার জন্য রওনা হলো। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এবারই প্রথম আমিসহ আরও দু'জন ব্যর্থ হলাম। মনে দারুণ কষ্ট নিয়ে ফিরে এলাম হাম হামের পেটে। বেঞ্চে বসে বিশ্রাম নিচ্ছি আর তাকিয়ে আছি অবারিত জলরাশির পানে। কয়েকটি ট্যুরে বিরতি নেওয়া অলরাউন্ডার আক্তার আর টাইগার জসিম হাম হাম অভিযানে তাদের পুরনো ফর্মে ফিরে এসেছে। দাপিয়ে বেড়াল অন্য সবার চেয়ে বেশি। বিশেষ করে এমন দুটি জায়গা ওরা দু'জন অতিক্রম করেছে, যা সত্যিই ভয়ানক। সে সঙ্গে দারুণ রোমাঞ্চকরও বটে। মনে হলে এখনও শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়। খুব সকালে বের হওয়াতে অনেক সময় নিয়ে প্রকৃতিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছি।
এবার ফেরার পালা। বিকেল ৪টায় যেন ঘোর সন্ধ্যা। পথ চলছি, হঠাৎ ঝুপ করে বাঁশ গাছ থেকে ঠিক আমার পাশেই একটি সাপ লাফ দিয়ে ব্যাঙ ধরে নিল। মুহূর্তেই ঘটনাটি ঘটল, মনে হলো ডিসকভারি চ্যানেলের ভয়ঙ্কর কোনো দৃশ্য বাস্তবে দেখছি। বন, জঙ্গল, পাহাড়, জলাশয় অনেক ঘুরেছি; কিন্তু এত কাছ থেকে এমন দুর্লভ দৃশ্য কখনও চোখে পড়েনি। জলপ্রপাতের উৎস দেখতে না পারার যে বেদনা ছিল তা নিমিষেই মলিন হয়ে গেল। গাইডের মাধ্যমে জানতে পারলাম, সাপটি ছিল বিষাক্ত দাড়াশ। ফুরফুরে মেজাজে পথ চলছি। মনে হলো এ পথ দিয়ে যেন আগে কখনও আসিনি। যত দেখছি তত লাগছে ভালো। হাম হাম সত্যিই তুমি আমাদের কী মায়ায় জড়ালে?
সব মায়ার জাল ছিন্ন করে কলাবন এসে হাজির। ক্ষুধায় পেট চো চো। চট আর মুলি দিয়ে ঘেরা এক খাবার হোটেলে ঢুকলাম। ডিম ও ডাল দিয়ে পেট চুক্তি ৩৫ টাকা প্লেট। ক্ষুধা পেটে তাই অমৃত স্বাদ। কোনো এক অজানা বারণে_ 'দে ছুটের' সর্বদা ভ্রমণসঙ্গী কচি স্বল্প পরিসরের বেড়াজাল থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না। আর নতুন সঙ্গী হাবিব তার কথা নাইবা লিখলাম। কারণ উচ্চশিক্ষিত হাবিবকে তার বন্ধু রশিদই হাবু বলে ডাকে। খাবারের পর্বর্ শেষ। সিএনজি স্টার্ট। রাতেই ফিরব যান্ত্রিক শহর ঢাকার পথে।
দেশের সবচেয়ে বেশি পর্যটন স্পট হলো মৌলভীবাজার জেলায়। হাতে তিনদিনের সময় নিয়ে গেলে শ্রীমঙ্গলের সিতিষের চিড়িয়াখানা, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, চোখ জুড়ানো চা বাগান, অতিথি পাখি অভয়ারণ্য বাইক্কা বিল, মাধবপুর লেক, চা গবেষণা কেন্দ্রসহ আরও অনেক কিছু। ভ্রমণের ফাঁকে সাত রঙের চা-পান তো হবেই।
'দে ছুট' ভ্রমণ সংঘের হাম হাম জলপ্রপাত ভ্রমণে সহযোগিতা করার জন্য বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাহিত্যিক তাপস মজুমদার ও ভ্রমণবিলাসি সুজন এবং শ্রীমঙ্গলের সুধীজন বদরুলকে আন্তরিক ধন্যবাদ। যে শহরের মানুষ নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, কোলাহল নগরী ঢাকার ফকিরাপুল গাড়ি এসে থামল। যে যার মতো বিদায় নিচ্ছে। এবারও কচির সেই পুরনো সহজ-সরল উক্তি_ দোস্ত জাভেদ, তোর জন্যই আমার এত কাছ থেকে প্রকৃতিকে দেখা।
যোগাযোগ : ঢাকার গাবতলী, ফকিরাপুল, সায়েদাবাদ থেকে সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বিভিন্ন পরিবহনের বাস যায়। শ্রীমঙ্গলে রাতযাপনের জন্য বেশ কয়েকটি ভালো মানের হোটেল রয়েছে। স্থানীয়দের আচার-ব্যবহার পর্যটনবান্ধব।

সৌজন্যে: দৈনিক সমকাল

Read 376612 times